fbpx
পরিবেশ ও জীববৈচিত্রবাংলাদেশসমগ্র ঢাকাস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

ঢাকা জুড়ে ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ

করোনা’ভাইরাস সং’ক্রমণের চিহ্নিত পাঁচটি ক্লাস্টারের (একটি জায়’গায় কম দূরত্বের মধ্যে অনেক রোগী) দুটি রাজ’ধানী ঢাকায়। কিন্তু রাজধানীর ওই দুটি এলাকা’তেই কেবল সংক্রমণ সীমিত নেই। এখন প্রায় পুরো রাজ’ধানীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত রাজধানীর ৪৬টি এলাকায় সংক্রমণ পাওয়া গেছে। দেশে চিহ্নিত মোট রোগীর ৫৬ শতাংশই রাজ’ধানীর বাসিন্দা।

 

ঢাকা মহানগরীর বাইরে ঢাকা জেলাসহ ২২টি জেলায় সংক্রমণ ধরা পড়েছে। গতকাল পর্যন্ত করোনা’ভাইরাসে সংক্রমিত ২১৮ ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২৩ জন (৫৬ দশমিক ৪২ শতাংশ) ঢাকা মহা’নগরীর বাসিন্দা। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠা’নের (আইইডিসিআর) দেওয়া তথ্যে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

 

সংক্রমণ ঠেকাতে রাজ’ধানীর যেসব জায়গায় রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেখানে সীমিত পরিসরে ভবন বা গলি লকডাউন (অবরুদ্ধ) করা হচ্ছে। গত রাত পর্যন্ত রাজধানীর অন্তত ৫৪টি জায়গায় এ ধরনের লক’ডাউন করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। রাজ’ধানীর বাইরে গতকাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ, পিরোজ’পুর, সাত’ক্ষীরা, কক্স’বাজার, নরসিংদী ও টাঙ্গাইল—এই ছয়টি জেলা পুরো লকডাউন করা হয়েছে।

 

এ ছাড়া যেসব এলাকায় নতুন আক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে লক’ডাউন করছে প্রশাসন। কোথাও কোথাও এলাকা’বাসী নিজেদের উদ্যোগে লকডাউন করছেন। কিন্তু সব জায়গায় লক’ডাউন পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

 

গতকাল নতুন শনাক্ত ৫৪ জনের মধ্যে ৩৯ জনই রাজধানীর বাসিন্দা। গত রোববার পর্যন্ত রাজ’ধানীর ২৯টি এলাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। গত মঙ্গল’বার পর্যন্ত ছিল ৪২টি এলাকায়। গতকাল সংক্রমিত এলাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬-এ। রাজ’ধানীর মিরপুর ও পুরান ঢাকা অঞ্চলে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনা’মূলক বেশি। ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরার মতো অভিজাত এলাকাগুলোতেও সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।


মোট আ’ক্রান্তের ৫৬ শতাংশ রাজ’ধানীর বাসিন্দা। ৪৬টি এলাকায় রোগী চিহ্নিত। মিরপুর ও পুরান ঢাকায় বেশি।


 

মিরপুরে শনাক্ত ২৭ জন
বৃহত্তর মির’পুরে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৭ জন। গত’কাল নতুন করে ওই অ’ঞ্চলের ১০ জনের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ২৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে মিরপুরে।

মির’পুরের টোলার’বাগ এবং বাসাবোকে আগেই ক্লাস্টা’র হিসেবে চিহ্নিত করে আইইডিসি’আর। উত্তর টোলার’বাগে ২১ মার্চ ও ২২ মার্চ পরপর দুই ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁদের সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ ভ্রমণ বা বিদেশ’ফেরত কারও সংস্পর্শে যাওয়ার ইতিহাস ছিল না। তাঁদের মৃত্যুর ঘটনাকে দেশে সংক্রমণের নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

গত মঙ্গলবার পর্যন্ত টোলার’বাগে মোট ৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া যায়। গতকাল আরও ৩ জন শনাক্ত হয়। টোলার’বাগে এখন মোট শনাক্তের সংখ্যা ১০। এর বাইরে মিরপুর ১-এ গতকাল নতুন ৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত মির’পুর ১-এ ৮ জন এবং মির’পুর ১০, ১১ ও শাহ আলী’বাগে ২ জন করে ৬ জন, কাজীপাড়া, মিরপুর ১৩ ও পীরের’বাগে ১ জন করে ৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

মির’পুরের টোলার’বাগ এলাকা এবং পাঁচটি ভবন লক’ডাউন করেছে পুলিশ। এর মধ্যে টোলার’বাগ লক’ডাউন রয়েছে গত ২৪ মার্চ থেকে। এর আগে স্থানীয় লোকজন নিজেদের উদ্যোগে ওই এলাকা লক’ডাউন করেছিলেন। দারুস সালাম থানার ভার’প্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তো’ফায়েল আহমেদ বলেন, এখান’কার বাসিন্দারা প্রথম দিকে বিধি’নিষেধ মানতে চাননি। এরপর থানা থেকে পালাক্রমে পুলিশ সদস্যরা পাহারা দেওয়া শুরু করেছেন। একজন উপ’পরিদর্শকের নে’তৃত্বে পাঁচজন পুলিশ সদস্য পাহারা দেন। কোনো বাসিন্দা’র কিছু প্র’য়োজন হলে মালিক সমিতি ব্যবস্থা করছে।

 

পুরান ঢাকায় শনাক্ত ২৯
রাজ’ধানীর জনবহুল এলাকা পুরান ঢাকা। সেখানেও সংক্রমণ বাড়ছে। বৃহত্তর পুরান ঢাকা’য় গত’কাল পর্যন্ত ২৯ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ওই অঞ্চলে গত’কাল নতুন ৬ জন চিহ্নিত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পুরান ঢাকার ওয়ারীতে ৯ জন, লালবাগে ৫ জন, সোয়ারী’ঘাটে ৩ জন, ইসলামপুরে ২ জন, বাবু’বাজারে ২ জন এবং হাজারীবাগ, উর্দু রোড, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, কোতোয়ালি ও বংশালে ১ জন করে শনাক্ত হয়েছে।

ওয়ারী এলাকার র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট ও বন’গ্রামের দুটি গলি লকডাউন করেছে পুলিশ। ওয়ারী থানার ওসি মো. আজি’জুর রহমান বলেন, দুটি এ’লাকায় তাঁরা টহল বাড়ি’য়েছেন এবং সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করছেন। তাঁরা মানুষের শত’ভাগ সহ’যোগিতা পাচ্ছেন না, তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডিতেও বাড়ছে
ধান’মন্ডি এলাকায়ও সংক্রমণ বাড়ছে। গত’কাল নতুন করে ধান’মন্ডি ও জিগা’তলায় চারজনের মধ্যে সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে। ধান’মন্ডিতে এখন পর্যন্ত ৯ জন শনাক্ত হয়েছে। এর পার্শ্ববর্তী জিগাতলায় ৩ জন, গ্রিন রোডে ২ জন এবং সেন্ট্রাল রোড, শাহবাগ ও বুয়েট এলাকায় ১ জন করে আক্রান্ত আছে।

রাজ’ধানীর মোহাম্মদ’পুর অঞ্চলে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮ জন করোনা রোগী চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ’পুরে ৬ জন এবং আদাবর ও বসিলায় আছে ১ জন করে।

পুলিশের ধান’মন্ডি অঞ্চলের অতি’রিক্ত উপ’কমিশনার আবদুল্লাহিল কাফি বলেন, কোন এলাকা বা ভবনের বাসিন্দা শনাক্ত হয়েছেন সে বিষয়টি আইইডিসিআর তাঁদের জানায় না। তাঁরা নিজেরা ধানমন্ডি ৬/এ-এর একটি বাসার কথা জানতে পেরেছিলেন। সেই বাসা লক’ডাউন করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়মিত তথ্য দেওয়া হলে তাঁরা আরও বেশি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।

বাড়ছে উত্তরা, গুলশানেও
গত মঙ্গল’বার গুলশান এলাকায় প্রথম একজন রো’গী চিহ্নিত হয়। গতকাল আরও ৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এখন গুল’শানে মোট শনাক্ত আছে ৬ জন। উত্তরায় নতুন ২ জন মিলিয়ে এখন শনাক্ত রোগী আছে ৫ জন। এ ছাড়া বসুন্ধরা আ’বাসিক এলাকায় ৩ জন, তেজ’গাঁওয়ে ২ জন এবং নিকুঞ্জ, আশকোনা ও মহাখালীতে ১ জন করে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে।

গত’কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গুলশান এলাকায় লক’ডাউনের খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ’কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, এখান’কার আক্রান্তরা নিকুঞ্জ, বাড্ডা ও বসুন্ধরা এলাকায়। এই তি’নটি এলাকায় লকডাউন করা হয়েছে।

 

বাসাবোতে বাড়েনি
এখন পর্যন্ত একক জায়’গা হিসেবে রাজ’ধানীর বাসাবো এলাকায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। গত মঙ্গল’বার পর্যন্ত ওই এলাকায় ৯ জ’নকে শনাক্ত করা হয়। অবশ্য কয়েক দিন ধরে সেখানে নতুন রোগী শনাক্ত হয়নি। ওই এলাকা লক’ডাউন অবস্থায় আছে।

ঢাকা মেট্রো’পলিটন পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, কোনো এলাকা বা ভবন লকডাউন ঘোষণা করা মানে কেউ সেখান থেকে বের হতে পারবেন না এবং বাইরে থেকে কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না। কারও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দরকার হলে প্রয়োজন সাপেক্ষে একজন বের হতে পারবেন। প্রয়োজন শেষ হওয়া’মাত্র তিনি আবার আবাসস্থলে ফিরে যাবেন।

ক্লা’স্টার হিসেবে চিহ্নিত বাসাবোর রাস্তায় আগের দুই দিনের তুল’নায় গতকাল লোকজন কম দেখা গেছে। তবে বিভিন্ন বাসার ছাদে তরুণদের আড্ডা দিতে দেখা গেছে। এ ছাড়া খাবার বা ওষুধ কেনার জন্য অনেককে বের হতে হয়েছে। পাড়ার ভে’তর কিছু চায়ের দোকানও খোলা ছিল। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এখানকার বালুর মাঠে, কাজী অফিস, ছায়া’বীথি, বাসাবো পাটো’য়ারি গলি, মাদার’টেকের নতুন’পাড়া মাঠে তরুণেরা আড্ডা দেয়। আইন’শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ির আওয়াজ শুনলে তাঁরা সরে যান।

বাসা’বোর ঘনবসতি’পূর্ণ এলাকা ওহাব কলোনি। একেক’টি ছোট্ট ঘরে ৫ থেকে ৬ জন থাকেন। গরমের কারণে তাঁরা কেউই ঘরে থাকছেন না। অনেক বাসায় নিয়’মিত গৃহ’কর্মী আসছেন। ডিশ, ইন্টারনেট বিল নিতেও বাসায় লোক’জন যাচ্ছেন।

বাসা’বোর কাছেই নন্দীপাড়ার একটি গলি লক’ডাউন করেছে পুলিশ। নন্দী’পাড়া ব্রিজ পার হলেই হাতের বাঁয়ে পড়ে গলিটি। গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গ’লির মুখে কাঠ দিয়ে অস্থায়ী গেট করে দিয়েছে সবুজ’বাগ থানার পুলিশ। গেটে লেখা আছে, ‘সাব’ধান, করোনা আক্রান্ত গলি, মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস পরে প্রবেশ করুন’। সেখানে এই প্রতিবেদক ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে ১১ জনকে গেট দিয়ে যাতায়াত ক’রতে দেখেন। তাঁদের মধ্যে ছয়’জনের মুখে মাস্ক ছিল না। হাতে গ্লাভস ছিল না কারোর’ই।

সবুজ’বাগ থানার ওসি মাহবুবুল আলম বলেন, গলির ভে’তর মূলত নয়টি ভবন লকডাউন করা হয়েছে। এই ভবন’গুলোতে যাতায়াতে কড়াকড়ি রয়েছে।

 

অন্যান্য এলাকা
এর বাইরে যাত্রা’বাড়ীতে ৫ জন, পুরানা পল্টনে ২ জন এবং বে’ইলি রোড, ইস্কাটন, মগ’বাজার, রামপুরা, শাহজাহান’পুর ও বাড্ডায় ১ জন করে করোনা’ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। করোনায় আ’ক্রান্ত থাকায় গতকাল মগ’বাজারের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন লক’ডাউন করা হয়। এর আগে মগ’বাজার এলাকায় আরেক’টি ভবন লক’ডাউন করা হয়েছিল।

 

রমনা থানার ওসি মো. মনি’রুল ইসলাম বলেন, একেকটি ভবনে ৪০ থেক ৫০টি ফ্ল্যাট থাকে। এর মধ্যে অনেক চিকিৎসক, ব্যাংকার থাকেন; যাঁরা জ’রুরি সেবার আওতায় পড়েন। তাঁদের লক’ডাউন বলেও আটকে রাখা যায় না।

 

 

দেশে প্রথম করোনা’ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। তখন শনাক্ত হয়েছিল তিন’জন রোগী। এক মাসের মা’থায় সেটা দাঁড়িয়েছে ২১৮ জনে। কোনো দেশে সংক্রমণ জন’গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সে’টাকে সংক্রমণের চতুর্থ স্তর ধরা হয়। বাংলা’দেশ এখন সেই স্তরে।

 

 

সর’কার আশঙ্কা করছে, চলতি মাসে পরি’স্থিতি ভয়া’বহ আকার ধারণ করতে পারে। রাজ’ধানীতে সংক্রমণের চি’ত্রও সে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Facebook Comments

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button